মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব আলী
আমি মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব আলী বলছি।।
খালিদুর রহমান
০১৯৯৫২৯১৯৭৯
khalidurr82@gmail.com
আমি নওয়াব আলী।বাড়ী বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার, জামালপুর মহকুমার,শেরপুরের নিকটবর্তী,শ্রীবরদীর,ভেলুয়া গ্রামে।ভেলুয়া এম কে আলিম মাদ্রাসার ঠিক পশ্চিমেই আমার বাড়ী।
বয়স ২২ বৎসর। উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। দেহের বর্ণ কালো।বুকের ছাতি ছাপ্পান্ন।ওজন ৮০ কেজি।দৈহিক পরিচয়টা কেন দিলাম তাহলে শুনুন।
হাডুডু,কাবাডি,ফুটবল,ভলিবল খুব ভাল খেলি।খুব সহজেই দূ/ তিন জনকে যখন তখন ধরাশায়ী করতে পারি।এক কথায় আমাকে সুপুরুষ বলা যেতেই পারে।
খেলাধুলা আমার নেশা।প্রতিদিন ডাক আসে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাওয়ার জন্যে। সংসারে কাজের চাপ। বাবা খুবই কড়া।তাই প্রতিদিন প্রয়োজন সাপেক্ষে রাতের বেলায়ও কাজ করি বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য।
১৯৬৪ সাল।
লেখাপড়া করার সময় পাইনা।
চারবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারিনি।
সর্বশেষ ঝগড়ারচর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়,শ্রীবরদী,শেরপুর থেকে পঞ্চম বারের মত মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিই।
পরীক্ষার শেষের দিন সিদ্ধান্ত নিলাম আর বাড়ী ফিরে যাবোনা।পঞ্চম বারের মত মেট্রিক ফেল করলে মানসম্নান আর থাকবেনা।
খবর পেলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে লোক নিয়োগ হচ্ছে। লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম।অফিসারের নজরে পরে গেলাম। চাকুরী হয়ে গেল।
ঢাকা থেকে সরাসরি পোষ্টিং করাচী।
১৩ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট আমার কর্মক্ষেত্র।
অতঃপর কঠোর প্রশিক্ষন। মাস তিনেক যাবার পরে আমার নজরে পরে পার্শ্ববর্তী বেটালিয়ানদের প্রতি।
তাদের পোষাক,তাদের ব্যাজ,প্রশিক্ষন পদ্ধতি আমাকে আকর্ষন করতে থাকে।
কিন্তু তাদের কাছে যাবার সুযোগ পাইনা।একদিন পানি খাবার নাম করে কমান্ডো বেটালিয়ান গ্রাউন্ডে গিয়ে হাজির হলে অফিসারের দৃষ্টিগোচরিত হই।
অফিসার আমাকে উর্দুতে জিজ্ঞেস করে, "তুমি কমান্ডোতে আসবে?"
আমি সম্মতি জানালে অফিসার আমার নাম লিখে রাখে।
একদিন কমান্ডো বেটালিয়ান অফিসার এর কাছ থেকে আমার বেটালিয়ান অফিসার এর কাছে নির্দেশ আসে আমাকে কমান্ডো বেটালিয়ানে পাঠানোর জন্য।
অফিসার আমাকে ছেড়ে দেয়।
কঠোর প্রশিক্ষন।বিমান থেকে নিরাপদে প্যারাসুট দিয়ে ভূপৃষ্ঠে অবতরন করতে হবে।
প্যারসুট জাম্প করতে হবে ৭ বার।কিন্তু ৬ষ্ঠ বার জাম্প করার সময় প্যারাসুটের একটি রশি ছিড়ে যাওয়ায় বা যেকোন যান্ত্রিক গোলযোগের কারনে গিয়ে পরলাম একটি পাথরের ওপর।
আমার বাম পা টা ভেঙ্গে গেল।কর্তৃপক্ষ আমার সুচিকিৎসার ব্যাবস্থা করলেন।
সমস্যা হল ৭ম বারের সফল প্যারাসুট জাম্প না করতে পারলে আমার আবার
নতুন করে ট্রেনিং শুরু করতে হবে। অফিসাররা আমাকে অংশগ্রহন করতে নিষেধ করলেন।
কিন্তু আমি পরের দিন প্লাষ্টার করা পা নিয়েই আমি প্রশিক্ষন গ্রাউন্ডে গিয়ে উপস্থিত হলাম।
সবাই আমাকে নিষেধ করল কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা।
শতশত দর্শক সৈনিকেরা আমার একপায়ের প্যারাসুট জাম্প দেখার জন্য অধীর আগ্রহে মাঠে অপেক্ষা করতে থাকে।
অবশেষে ভাঙ্গা,প্লাস্টার করা এক পা নিয়ে আমি সফল ৭ম বার প্যারাসুট জাম্প করি।
পাকসেনারা আমাকে জানবাজ বাঙ্গাল উপাধি দেয়।
পাকিস্তান সরকার আমাকে ৭টি মেডেল দিয়েছে যেটা আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।গেরিলা প্রশিক্ষন করেছি সুদীর্ঘ সময় ধরে।জলে,স্থলে,আকাশে সর্বত্র যুদ্ধের জন্যে কমান্ডো প্রশিক্ষন নিয়েছি।
সমস্ত পূর্ব বাংলায় মাত্র ১২ জন কমান্ডো। তারমধ্যে আমি একজন।এজন্য বিশেষ পদক ও সম্মাননা পেয়েছি।
প্রশিক্ষনকালীন অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কমপক্ষে চল্লিশ কেজি ওজনের মারনাস্ত্র,গোলাবারুদ সঙ্গে নিয়ে দিনের পর দিন হাটতে হয়েছে।গোসলের সুযোগ নেই।দাঁড়ানো অবস্থাতেই খেতে হয়েছে।
সেকি খাওয়া! কোন রকমে জীবন বাঁচানো। পায়ের মোজা পায়ের চামড়ার সাথে লেগে গেছে। জুতা, মোজা খোলার সময় রক্তারক্তি কান্ড।
এভাবেই প্রশিক্ষনের পুরো একটি বছর শেষ হলো। সফলভাবে প্রশিক্ষন সম্পন্ন করলাম।
অনেকেই প্রশিক্ষনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পালিয়েছে।আমি পালাইনি।পালানো আমার বৈশিষ্ট্য নয়।
এরপর সেনাবাহিনীর নিয়মিত ডিউটি শুরু হল। সফলভাবে প্রশিক্ষন সম্পন্ন করার কিছুদিনপর আমার পদোন্নতি।
১৯৬৬ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে অংশগ্রহন করেও আমি কৃতিত্বের পরিচয় দিই।
প্রকৃতির নিয়মে দিন কাটতে থাকে।
দেশের জন্যে, মা বাবা,ভাই বোনের জন্যে মন কাঁদে।বড্ড অস্থির লাগে। দেশে ফেরার বাহানা খুঁজি। কোন উপায় নেই।
তথ্য পেলাম আমার সম পদের পশ্চিম পাকিস্তানের একজন সৈনিক ঢাকায় কর্মরত আছে। তার ঠিকানা সংগ্রহ করলাম। তাকে তারবার্তা প্রদান করলাম যে সে যেন তার জন্মভূমিতে ফিরে এসে আমাকে আমার জন্মভূমিতে ফিরে যাবার সুযোগ প্রদান করেন।
উপর মহলের সাথেও যোগাযোগ করলাম। এই পদ্ধতিতে বদলিতে তাদের সম্মতি আছে।
১৯৬৯ সালের প্রায় পুরো বছর জুড়েই আমার চাচাত ভাই এবং সুমুন্ধি মুক্তার আলী শিকদার বারবার চিঠি লিখেছিল দেশে ফিরে আসার জন্যে।
সে জানিয়েছিল দেশের রাজনীতিতে একটা পট পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের দেশে থাকাটা জরুরী।
আমি চিঠির উত্তর দেয়ার মত সময়ই পাইনি।৭০ এর এপ্রিলে আমি টাঙ্গাইলের, ভূয়াপুরের, দশানী বকশিয়া গ্রামে আমার দাদার বাড়ী এবং শ্বশুরবাড়ী বেড়াতে আসি।
মুক্তার আলী শিকদার আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করে "বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এই স্বাধীনতা অর্জনে আমাদেরকে অনেক খড়,কাঠ পূড়াতে হবে। আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে।"
আমি হেসে উড়িয়ে দিই। এও কি সম্ভব? পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া কি সহজ?
মুক্তার আলী আমাকে ভূয়াপুরের এক জনসভায় নিয়ে যায়। সেখানে একাধিক নেতৃবৃন্দ এবং মুক্তার আলী নিজেও বক্তব্য দেয়। দেখা হয় এলাকার আরও অনেক মুরুব্বীদের সাথে।
দাদার পরিচয় এবং মুক্তার আলীর ভগ্নিপতি পরিচয়ে এলাকার মানুষ যথেষ্ট সম্নান, আদর,স্নেহ করতে থাকে।সবাই আমাকে বুঝাতে থাকে এই দেশ পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে চললে আজীবন শোষিত,বঞ্চিত হতেই থাকবে।
কিছুটা হলেও আমার মগজে ঢুকে। আমি গভীর ভাবে ভাবতে থাকি।
মানুষের মুখে মুখে এখন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন,১৯৬৬ এর ছয় দফা,১৯৬৯ এর গনঅভ্যূত্থান,১৯৭০ এর নির্বাচনের মত ঐতিহাসিক প্রহসন সংলাপ ।
আমি মুক্তার আলীর প্রবল বাঁধা সত্তেও করাচী ফিরে যাই। দেশের জন্যে,দেশের মানুষের জন্যে নতুন করে ভাবতে থাকি। মুক্তার আলী আমাকে দূদিন পরপরই চিঠিতে চাকুরী ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করতে থাকে।
ইয়াহিয়ার ভন্ডামী বাংলার জনগন মানবেনা বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর মত বাগ্মী,দূঃসাহসী,দূরদর্শী নেতা যখন দেশের নেতৃত্ব দেবে তখন দেশের মানুষ তার কথা না শুনে আর কি করবে?
২৮শে ফেব্রুয়ারী'১৯৭১ আমি দশানী বকশিয়া ফিরে আসি। আমার স্ত্রী তখন ওখানেই বাবা মায়ের কাছে।দেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।
১১ নাম্বার সেক্টরের আঞ্চলিক কমান্ডার, টাঙ্গাইলের বাঘা সিদ্দীকি খ্যাত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকির বাহিনীর একজন প্লাটুন কমান্ডার ঘাটাইলের আঃ সাত্তার সংবাদ পান যে নওয়াব আলী নামে একজন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙ্গালী নওজোয়ান গেরিলা যোদ্ধা দশানী বকশিয়া গ্রামে আত্বগোপন করেছে।
আঃ সাত্তার খোজ নিয়ে জানতে পান নওয়াব আলী দশানী বকশিয়ার মুক্তার আলীর বোন জামাই।
তিনি ছুটলেন দশানী বকশিয়া গ্রামে নওয়াব আলীর সন্ধানে।নওয়াব আলীর খোজ পেয়ে গেলেন।
তিনি আমাকে নিয়ে ভুয়াপুরে গেলেন।সাথে আমার সুমুন্ধি এবং জেঠাত ভাই মুক্তার আলী। প্রথমে আমি ভয় পেয়েছিলাম।পরে আশ্বস্ত হলাম।
আঃ ছাত্তার সাহেব আমাকে অনুরোধ করলেন,দেখুন স্যার, আপনি একজন গেরিলা যোদ্ধা।আর জাতির এই চরম ক্রান্তিলগ্নে আপনার মত একজন দক্ষ চৌকষ যুদ্ধবিদ্যার একজন দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে জাতি উপকৃত হবে।
তাঁর কথায় আমি বিমোহিত।আমি রাজী হলাম।৪ ঠা এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে শুরু হল আমার প্রশিক্ষন প্রদান কার্যক্রম।
কোন অশ্র ছাড়া শুধু বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষন প্রদান খুব সহজ কাজ নয়।তবুও প্রশিক্ষন চলে প্রায় ১৫ দিন ধরে।
এরপরে জ্বনাব কাদের সিদ্দীকির সহায়তায় পূর্নাঙ্গ কমান্ড গঠন করা হয়।কমান্ডের প্রধান করা হয় জনাব হাবিবুল হক খান বেনু মিয়াকে, আমাকে করা হয় সেকেন্ড ইন কমান্ড। আমাদের দলের যাবতীয় কার্যক্রম প্রায় আমাকেই করতে হয়।
জনাব আঃ ছাত্তার সাহেবকে নতুন প্লাটুন গঠন করে তাকে অন্য এলাকায় অপারেশনে পাঠানো হয়।
মুক্তার আলী এবং আরও কতিপয়৪ মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরামর্শক্রমে খন্ড খন্ড যুদ্ধ শুরু করলাম।
বকশিয়ার আশেপাশে পাকবাহিনী বা রাজাকারদের অতিষ্ঠ করে তুললাম।ওরা
ওরা বুঝতে পারে ছয়ানিবকশিয়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত ঘাটি আছে।হঠাত করেই একদিন ওরা দশানী বকশিয়া গ্রামের একাংশে একাধারে কয়েকটা শেল নিক্ষেপ করে।গ্রামের ঐপাশের বাড়ীঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।সাধারন মানুষ আমাদের দোষারোপ করতে থাকে।আমাদের জন্যেই তাদের এই দূর্দশা!
আরেকদিন পাকবাহিনীর একটা দল গ্রামের একপাশ থেকে গুলি করে গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত যায়।যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে মেরে ফেলছে।
আমাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র তেমন নেই।একটা মেশিন গান,দূতিনটা রাইফেল আর কিছু গোলাবারুদ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মারফত কাদের সিদ্দীকির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি।
আমরা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ধান ক্ষেতের আড়ালে সশস্ত্র পজিশন নিয়ে শুয়ে আছি।ওরা আমাদের নাকের ডগা দিয়ে গুলি করতে করতে চলে গেল। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম ওদের ফিরে আসার জন্য।
ফিরে আসার সময় ওদের বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেল।পরস্পর হাসি ঠাট্রা করতে করতে এগিয়ে আসছে। আমি আমার মেশিনগান সেট করে রেখে দিয়েছি।আমার সাথের মুক্তিযোদ্ধারা একএকজন উত্তেজনায় শোয়া থেকে উঠে বসার উপক্রম করছে। আমি কোনরকমে ওদের ঘারে চাপ দিয়ে শুইয়ে রাখলাম। আমার অস্ত্রের আওতার মধ্যে আসতেই আমি মেশিনগান চালু করে দিলাম। টাটাটাটাটা....... সাইসাইসাই।এক ট্রিগারের এক টিপেই প্রায় ৫০ জন পাক সেনাকে খতম করে দিলাম।
সেদিন গ্রামবাসী আমাকে মাথায় নিয়ে নেচেছিল।
৫ ই মার্চ তারিখে সেনাসদর থেকে আমার নামে চিঠি আসে চাকুরীতে যোগদান করার জন্য। এরমধ্যে রেডিওতে ৭ ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষন শুনলাম।
রক্তে আগুন ধরে যায়। সিদ্ধান্ত নিলাম আর চাকুরীতে ফিরে যাবোনা। যা হয় হোক।২৫ শে মার্চের কালো রাত্রিতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় এদেশের সাধারন নিরস্ত্র মানুষের উপর পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা,নির্যাতন,জুলুম,অগ্নিসংযোগ,মা বোনেদের ওপর শ্লীলতাহানির মত জঘন্য অপরাধ সংঘটন।
মুক্তার আলীর মাধ্যমে যোগাযোগ হয় ভূয়াপুরের কাঠালতলার শাহালম, গৌরাঙ্গীর
মোখলেছ এবং এরকম আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে।তখনও আমাদের হাতে তেমন অশ্রসশ্র নেই।
১২ ই এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভূয়াপুর থানা আক্রমন করি। কোন রক্তপাত ছাড়াই থানা আমাদের দখলে আসে।ওরা আত্বসমর্পন করে।সমস্ত অস্ত্রগুলো আমরা নিয়ে নিই।
রাত ৮ টার খাওয়া দাওয়ার পর আমরা গোপন বৈঠক করলাম। টাঙ্গাইল এলাকার মুক্তিযুদ্ধ প্রধানত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগদান করবো।
রাতেই শুনলাম গলগন্ডার হাবিব ভাই খবর পাঠিয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ যা পাওয়া গেছে সব নিয়ে, লোকজন সহ যমুনার পারে
যেতে বলেছে।
যমুনা নদীর তীরে পশ্চিম পাকিস্তানী একটা জাহাজ পেলাম। জাহাজ বোঝাই অস্ত্র আর গোলাবারুদ। জাহাজের দায়িত্বে যারা ছিল সবকটাকে মেরে ফেলি। অস্ত্র,গোলাবারুদ যা কিছু পেলাম বেশির ভাগই নামিয়ে ফেললাম। এত বেশি সংখ্যক অস্ত্র গোলাবারুদ যে,এগুলি নামিয়েও শেষ করা যাচ্ছেনা। হঠাৎ শুনলাম পাক বাহিনী আসছে।খবর শুনে দ্রুত জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিলাম।আমরা খুব দ্রুত অস্ত্র গোলাবারুদ গুলো ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে আমরা সবাই মিলে গলগন্ডার হাবিব ভাইদের বাড়ীতে গিয়ে অবস্থান করলাম।সেখান থেকে পরের দিন অস্ত্রগুলি কালিহাতী হয়ে সখিপুরে বিশ্বস্ত আরেক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম।
বেলা আনুমানিক ১১ টার দিকে হাবিব,মুক্তার আলী সহ আরও প্রায় শ' খানেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ব্রাহ্মনশাসন স্কুল মাঠে গেলাম কাদের সিদ্দীকির সাথে দেখা করতে।
হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে কাদের সিদ্দীকি।এখানে কাদের সিদ্দীকির সাথে আমার একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়।আমরা ফৌজিরা সাধারনত সেলুট দিয়ে থাকি ফৌজি অফিসারদেরকেই।কাদের সিদ্দীকি জেনারেল কমান্ডার।আমার দ্বারা তাকে সেলুট দেয়াটা ঠিক হয়ে উঠেনি। আর এজন্যই উনি আমার উপর মাইন্ড করলেন।উনি ভেবে নিলেন আমি উনার বিপক্ষের মতাদর্শের মানুষ। আর সে সময়ে কাদের সিদ্দীকি কাউকে শত্রু ভেবে নিলে তাকে যেকোন উপায়ে মেরে ফেলেন। এত ভাল এক যন্ত্রণা পয়দা হল দেখি।
যাই হোক মুক্তার আলী শিকদার এবং ভূয়াপুরের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ কাদের সিদ্দীকিকে বুঝাতে সক্ষম হল যে আমি পাক সেনাবাহিনীর একজন সেনাকর্মকর্তা ছিলাম। কিন্তু আমি চাকুরী ছেড়ে দিয়ে এখন পুরোদস্তুর একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক।
শেষ পর্যন্ত কাদের সিদ্দীকি আমার উপর সন্তুষ্ট হয় এবং আমার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে। তারপর প্রায় সপ্তাহ খানেক মুক্তিবাহিনীকে সময় দিলাম।
কাদের সিদ্দীকির সম্মতিক্রমে ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জের শরনার্থী শিবিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
মাথায় গামছা,পরনে লুঙ্গি,চাষাভূষার মত বেশ ধারন করে অত্যান্ত ঝুঁকি নিয়ে ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে বাংলাদেশীশরনার্থী শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম।সাথে ছোট ভাই রৌফকেও নিলাম।শরনার্থী শিবিরে একদিন থাকার পর কাউকে কিছু না বলে বাংলাদেশে এসে পরের দিনই আবার শরনার্থী শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম।দেখি আমাকে নিয়ে কানাঘোষা চলছে।ভারতের একজন মুরুব্বী আমার পরিচয় নিতে নিতে আমার দাদার আত্বীয় হিসেবে পরিচয় দিল। যাই হোক,সন্ধার পরে আনুমানিক রাত্রি ৮ টার পরে দুজন জোয়ান ভদ্রলোক আমার নাম ধরে ডাক দিল। আমি তাদের কখনও দেখিনি,চিনিনা।কিন্তু তাদের ব্যাক্তিত্ব আমাকে তাদের নির্দেশ অনুসরন করতে বাধ্য করে।ছোটভাই রউফ কান্নাকাটি শুরু করলে ইশারায় তাকে ধৈর্য্য ধারন করে শিবিরেই থাকতে বললাম।
যাই হোক জওয়ান ভদ্রলোক দূজন আমাকে নিয়ে প্রাইভেট কারে করে চলছে।কারো সাথে কোন কথা নেই।বিরাট বড় আঁকাবাঁকা পাহাড়ি অসমান পথ।প্রকৃতি যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কেবল গাড়ীর ইঞ্জিনের শব্দ।আমার হৃদপিন্ড যেন স্তব্ধ হবার জেগাড়।প্রায় দূ/ তিন ঘন্টা চলার পর তারা আমাকে নিয়ে এল এক নিস্তব্ধ ছোট্ট চিলেকোঠায়।একজন আমাকে নির্দেশ দিল চিলেকোঠার ভিতরে ঢুকতে। আমি বাধ্য ছেলের মত ঢুকলাম। ঘরে শুধুমাত্র একটি কাঠের চেয়ার। আর কিচ্ছু নেই। তারা বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিল। আমি বুঝলাম তারা আমাকে পাকিস্তানের চর সন্দেহ করে গ্রেফতার করেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ নেই। বাঁচার আশা বুঝি শেষ। যে কোন মুহুর্তে হয়তো গুলির শব্দ শুনতে পাব। তারপর ভবলীলা শেষ হয়ে যাবে। বাইরে বুটের আওয়াজের একটু একটু শব্দে বুঝলাম তারা আমাকে পাহাড়া দিচ্ছে।যাতে পালিয়ে যেতে না পারি।
দোয়া,দরুদ যা জানা আছে পরলাম। একসময় ভান্ডার ফুরিয়ে গেল। অতীতে ফিরে গেলাম। আমার শৈশব,কৈশর অতঃপর যৌবন।কি দূরন্ত দিনগুলি কেটে গেল। যেন ছায়াছবির মত এক একটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠছে। আমার মা,বাবা,ভাই,বোন,আমার স্ত্রী সবাইকে যেন দেখতে পাচ্ছি জায়নামাযে বসে দোয়া করছে। তাদের বুকের ধন মৃত্যুর মুখোমুখি।তারা শান্তিতে কিভাবে ঘুমাবে। বাইরে বোধ হয় চাঁদ উঠেছে। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে এই জায়গাটা মরুভূমির মত। নিঃসঙ্গ রাত্রির অন্ধকার ফুরে একটা প্রাণী মনে হল যেন পেঁচা ডাকছে। ঘরে ইদুরের খুটখাট শব্দ টের পেলাম।বাইরে ওরা দূজন যে আশেপাশেই আছে বুঝা গেল। আমি কোন প্রকার শব্দ করতে ভুলে গেছি।দূর থেকে মোয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি শোনা গেল। বুঝলাম দুচার মাইলের মধ্যে মসজিদ আছে।আমার চিন্তার গতি থেমে নেই। কি থেকে কি ভাবছি নিজেও জানিনা।শিরদাড়া টান টান। মৃত্যুর উপত্যকায় দাড়িয়ে স্বাভাবিক নাড়াচাড়া এমনকি একটু কাশি দিতেও ভুলে গেছি।ওরা আমাকে বেঁধে রেখে যায়নি কিন্তু তার চাইতে কঠিন বন্ধনে আমাকে জড় পদার্থ বানিয়ে এই চিলেকোঠায় রেখে গেছে।
একটু পরে সকালের সূর্যের রশ্মি ঘরের ফাকফোকর দিয়ে ভিতরে ঢুকল। সেই সাথে গতকাল রাত্রের জোয়ান ভদ্রলোক দূজনও তালা খুলে ঘরের ভিতরে ঢুকল। ওরা নিজেরাই বলাবলি করছিল," যে ভাবে রেখে গিয়েছিলাম সেভাবেই বসে আছে দেখছি।" আর কোন কথা নেই। আমাকে ঘর থেকে বের হয়ে গাড়ীতে ওঠার নির্দেশ দিল। গতকালকের সেই গাড়ীটাই। আবারও গাড়ী চলছে। যেন এভাবেই আজীবন চলতেই থাকবে।গন্তব্য কোথায় ওরাই জানে, আমি কিছু জানিনা।প্রায় তিন ঘন্টা চলার পর আমাকে ভারতের সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা অধিদফতরের কোথাও নিয়ে আসা হল। একজন চৌকষ অফিসারের সামনে আমাকে বসানো হল।শুরু হল আমার ইন্টার্গেশন। অফিসার আমাকে যা বললেন
আমি তা বাংলায় বলছি।
অফিসারঃ আপনি কে?
- আমি নওয়াব আলী। পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার, জামালপুর মহুকুমার নিকটবর্তী শেরপুরের, শ্রীবরদীর, ভেলুয়া গ্রামের একজন বাসিন্দা।
অফিসারঃ আপনার অবয়বে মনে হচ্ছে আপনি সেনাবাহিনীর সদস্য। আপনি কি পাক বাহিনীর চর? সত্য বলবেন। কারন আপনি মিথ্যে বললেও আমরা সত্যটা ঠিক খুঁজে বের করবো।
- আমি বললাম। না আমি পাক বাহিনীর চর নই। তবে একথা সত্য যে আমি পাকিস্তান সেবাবাহিনীর ১৩ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সেনা সদস্য।পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিশেষ ব্যাবস্থায় বদলী হয়ে ঢাকায় কর্মক্ষেত্রে আসার পরেই ছুটিতে বাড়ী আসি। এর মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়।আমি চাকুরীতে যোগদান না করে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগদান করি।
অফিসারঃ আপনার শরনার্থী শিবিরে আসার উদ্দেশ্য কি? আগের দিন এসে কাউকে কিছু না বলে পরের দিন চলে গেলেন। আবার ফিরে এলেন। কিন্তু কেন?
- আমি আসলে বাড়ী গিয়েছিলাম। বাবা মাকে বলে আসিনি। তাই বাবা মাকে বলতে গিয়েছিলাম।বলে আবারও চলে এসেছি।
অফিসারঃ আপনি এখন কি করতে চান?
- আমি এখন মুক্তিযুদ্ধ করতে চাই। ভারত সরকার এবং বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের সহযোগিতা চাই।
অফিসারঃ ঠিক আছে। আপনাকে মুক্তিবাহিনীর নওজোয়ানদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হল।আমি বাংলাদেশী প্রবাসী সরকারকে বলে দিচ্ছি।
- জ্বনাব অফিসার,আপনাকে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। আপনি আমার জন্য এবং আমার দেশের জন্য যা করলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তারপর অফিসার তার সহকারী দেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে আমাকে শরনার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দিলেন গাড়ীতে করে।
আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার শুরু হবে আমার মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পালা।
পরের দিন মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষন দেয়া শুরু করলাম। অনেক মানুষ। প্রায় পাঁচ হাজার। বিভিন্ন বয়সের। কচি তরুন,যুবক,মাঝবয়সী বৃদ্ধ।কারো চুল পেকেছে, কারোর পাকেনি। কেউ সুস্বাস্থ্যবান,কেউ হাল্কা গড়নের।এদের মধ্যে অল্প সংখ্যক যুবতী মহিলা।
সবাই যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চায়।জানি অনেকেরই শক্তি,সাহস,সামর্থ্যের অভাব রয়েছে। তবুও তারা মুক্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়েছে।
সবাইকে লাইনে দাঁড় করালাম। বিশাল বড় মাঠ।৫০০০ লোক সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ালে অনেক বড় দেখানোর কথা।কিন্তু আমার কাছে খুব বেশি মানুষ মনে হলোনা। পাকিস্তানীরা সশস্ত্র। সংখ্যায় ধারনাতীত।ওরা সুপ্রশিক্ষিত। অন্যদিকে আমাদের অস্ত্র,গোলাবারুদ,প্রশিক্ষিত জনবল সবকিছুই নগন্য।তবুও আমরা যুদ্ধে নেমেছি। ওরা আমাদের বাধ্য করেছে। নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
আমাদের অবলা মা বোনদের নির্যাতন,ধর্ষণ এবং খুন করেছে।আমরা এবার প্রতিশোধ নেব। প্রয়োজনে জীবন দেব। আমি মরলে যদি দেশ বাঁচে তবে মরেও শান্তি। সবার চোখেমুখে একটা চাপা ক্ষোভ।ভেতরের আগুনটাকে উস্কে দেয়ার জন্য পাঁচমিনিট অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। সবাই তন্ময় হয়ে আমার নির্দেশ অক্ষরে পালন করা শুরু করল।
লেফ্ট,রাইট,লেফ্ট,বাম,ডান,বাম
দল সামনে চলবে - সামনে চল
লেফ্ট, রাইট,লেফ্ট, বাম, ডান,বাম
দল ডাইনে ঘুরবে- ডাইনে ঘোর
লেফ্ট, রাইট,লেফ্ট- বাম,ডান,বাম
পাশাপাশি অন্যান্য আরও একাধিক জায়গায় মুক্তিফৌজ গঠনের কর্মকান্ড চলছে বিভিন্ন কমান্ডারের নেতৃত্বে। ইতোমদ্ধে জেনারেল এম এ জি ওসমানির নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
তখনও হ্যান্ড মাইকের ব্যাবহার এতটা শুরু হয়নি।তাই আমার বাঁজখাই গলাই ছিল ভরসা। রক্তের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করছি। ক্লান্তি কোথায় উঁবে গেছে জানিনা।কোথা দিয়ে দূপুর গড়িয়ে গেছে খেয়াল করিনি। জোহরের আযান হল। ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী প্রশিক্ষনের মহড়া দেখতে এলেন। সঙ্গে মন্ত্রী,এম এল এ এবং বাংলাদেশী প্রবাসী সরকার।
তারা কয়েকজন আমাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো অবস্থায় বক্তৃতা দিলেন। আমাদের উৎসাহ,উদ্দীপনা এবং সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।
তারপর অন্য কোন গ্রাউন্ডে চল গেলেন যেখানে অন্য কারোর নেতৃত্বে বাঙ্গালী মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের প্রশিক্ষন চলছে।
তারপর দূপুরের খাবার বিরতি। অল্প কিছু খেয়ে, কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে। আবার শুরু করলাম। রাইফেল ধরা,গুলি ছুড়া,গ্রেনেড ছুড়া,গেরিলা আক্রমনের কায়দা কানুন। সব কিছুই দেখিয়ে শিখিয়ে দিলাম।
মাত্র একদিন পার হল প্রশিক্ষনের। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই।দ্রুত প্রশিক্ষন শেষ করে দেশে ফিরে যেতে হবে। পাক বাহিনীকে তাড়াতে হবে। ওদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে হবে। সম্ভব হলে কালই রওনা হওয়াটা দরকার। তবুও সময় নিলাম। যেসব মানুষ কোনদিনও একটা বিড়ালকেও লাথি মারেনি তাদেরকেই মারতে হবে প্রশিক্ষিত পাকসেনাকে।আমি নিজেও একজন প্রশিক্ষিত পাক সেনা সদস্য ছিলাম। এখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা।আমি জানি পাক বাহিনীকে ঘায়েল করা অত সোজা নয়।
ওরা প্রশিক্ষিত, আমরা স্বল্প প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত।
ওরা দৈহিকভাবে শক্তিশালী, আমরা দূর্বল।
তবুও এই দেশটা আমাদের। ওরা এখানের মাঠ,ঘাট,জঙ্গল,নদী,হাওর,বাওর কিছুই চেনেনা। আর সবকিছুই আমাদের নখদর্পনে।ওরা মনের দিক থেকে দূর্বল আর আমরা মানসিকভাবে সবল। কারন আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মরতে যখব হবেই দুচারটাকে মেরে তারপর মরব।
তবে মুশকিল একটা আছে। এদেশীয় মির্জাফর,রাজাকার যারা দেশের সম্নানকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে কুলাঙ্গার পাকসেনাদের
হাতে হাত মিলিয়েছে,ওরা বড় একটা ঝামেলার কারন। গ্রামে গ্রামে ওদের রাজাকার ও শান্তি কমিটি বড় বিরক্ত করছে।পাক সরকার ওদেরও বহুত সুবিধা দিচ্ছে।
পাকবাহিনীর শত্রু আমরা মুক্তিযোদ্ধারা। আর আমাদের শত্রু পাক বাহিনী ও রাজাকার,আল বদর,আল শামছ, শান্তি কমিটি বিভিন্ন নামে কিন্তু কাজে একই।
যাই হোক প্রায় পনের দিন কঠোর প্রশিক্ষন চলল।তারপর আমাদেরকে প্রবাসী সরকার ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য গঠিত বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হলো। আমাদেরকে ১১ নং সেক্টরে পাঠানো হবে। তার আগেই
একদিন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী সাহেবের কাছ থেকে আমার প্রতি নির্দেশ আসলো আমি যেন অল্প কিছু সৈনিক এবং আরেকজন কমান্ডারকে সাথে নিয়ে বক্সিগঞ্জের কামালপুরে যুদ্ধে যাই। ওখানের অবস্থা খুবই খারাপ। এপ্রিলের শুরুর দিকে কামালপুর গিয়ে অবস্থান নিলাম।
সাথে কমান্ডার আবু তাহের। আমাদের সাথে প্রায় পাঁচশত মুক্তিসেনা। অর্ধেক দিলাম কমান্ডার তাহেরের দায়িত্বে। আর অর্ধেক সংখ্যক আমার দায়িত্বে।
পাক বাহিনীরা সংখ্যায় অসংখ্য।আমাদের সহযোগিতার জন্য আরও হাজার খানেক মুক্তি আশেপাশেই আছে।
আমরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরলাম। আমাদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম পশু,পাখি,প্রাণীর বিশেষ ডাক, এক এক সময় এক একটা।জঙ্গলেের সাথে,মাঠের সাথে,ক্ষেতের আইলের পাশে,নালা,ডোবা, নদীর পানিতে কচুরিপানার সাথে মিশে একাকার হয়ে যাই।হঠাৎ করে আক্রমন করি। আবার পাখির মত ফুরুত করে উরাল দিয়ে স্থান পরিবর্তন করি।
পাকবাহিনীকে বুঝানোর চেষ্টা করি তোদের চেয়ে সংখ্যায়,শক্তিতে আমরাও কম নই।
যাই হোক প্রায় সপ্তাহ ব্যাপী যুদ্ধ চলল। ওদের মেরেছি হাজারের ওপরে। আর আমাদের প্রাণ দিয়েছে শ ' খানেক। এদের লাশগুলি সাবধানে ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সরিয়ে এনে যে যার কাছের তার লাশ তার( জীবিত) কাছে দিয়ে দিয়ে বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম।
দূঃখের বিষয় হল আমাদের ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনের কপালে এসে লেগেছে একই সাথে প্রায় কয়েকটা গুলি।মগজ বেরিয়ে গেছে।রক্তে সারা শরীর লাল হয়ে গেছে।
পাকবাহিনী আপাতত পিছু হটেছে। সবাইকে যার যার বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনের লাশ আমি কাঁধে তুলে নিলাম।গন্তব্য ভারতের শরনার্থী শিবির। এক সাথে এসেছিলাম। এখন ওকে রেখে কিভাবে যাই।
ওর লাশটা রেখে গেলে শিয়াল শকুনে খাবে, নয়তো পাক বাহিনীরাও নিয়ে অচেনা কোথাও ফেলে দিতে পারে।শিবিরে সালাউদ্দিনের আপনার কেউ থাকলে সে অন্তত শেষ দেখাটা দেখুক।বাঙ্গালীরা সবাই মিলে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাযাটা অন্ততপক্ষে একসাথে করুক।
সালাউদ্দিনের লাশ আমার কাঁধে। রক্তে আমার সারা শরীর লালেলাল হয়ে গেছে।সারা রাত চলছি।মাঠ পেরিয়ে বন,জঙ্গল,নদী,ধান ক্ষেত।সকালের দিকে শরনার্থী শিবিরে গিয়ে পৌছে লাশটা মাটিতে নামাতেই হাজারও উৎসুক মানুষ ঘিরে ধরল।
আমার কদিনের একটানা পরিশ্রম,একই সাথে শত শত মৃত্যু দর্শন, বিশেষ করে সারারাত ধরে সালাউদ্দিনের রক্তাক্ত লাশ বহন আমার মনটাকে,চিন্তা চেতনাকে কেমন যেন উলট পালট করে দিল।
মনে হচ্ছিল যেন আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। উল্টাপাল্টা প্রলাপ বকছি। আমার অবস্থা দেখে কয়েকজন আমাকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।আমার চিকিৎসা চলল প্রায় পনের দিন ধরে।তারপর আল্লাহর রহমতে সুস্থ্য হয়ে উঠলাম।
বাড়ির জন্য মনটা বড্ড ছটফট করছে।দায়িত্ব প্রাপ্তদের বলে আমি বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।সন্ধ্যা নাগাদ বাংলাদেশের সীমানায় গিয়ে হাজির হলাম।
প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। ব্রহ্মপূত্র নদের ধার দিয়ে চলছি।একটা দোকান খোলা আছে দেখলাম। একটা পাউরুটি কিনে খেলাম।দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম।চিন্তায় মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ।
হঠাৎই চিন্তায় ছেদ পরে গেল।পাকসেনাদের একটা জিপ দোকানের সামনে এসে হাজির।দোকান থেকে বিভিন্ন সওদা নিচ্ছে আর দোকানীর সাথে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ়। ওরা আমাকে খেয়াল করেনি।ভাবলাম এই সুযোগ।বিড়ালের মত সাইট কেটে নদীতে নামলাম। তখন অন্ধকার নামছে। কচুরিপানার মাঝখানে নিজেকে আবদ্ধ রেখে, মাথায় কিছু কচুরীপানা নিলাম।কচুরীপানার মাঝখানে মানুষ আছে কেউ যেন বুঝতে না পারে সেই ভাবে অবস্থান করে ধীরে ধীরে নদীর স্রোতের অনুকূলে সারা রাত ধরে চলতে থাকলাম। সকাল হয়ে সূর্য উঠে গেলে বুঝলাম আমাদের কুশলনগরের পাশে এসেছি। নদী থেকে ওঠলাম। আস্তে আস্তে বাড়ী পর্যন্ত গিয়ে পৌছলাম।বাবা, মা,স্ত্রী তারা যেন জীবন ফিরে পেল। বাবা, মা জড়িয়ে ধরে বললেন," বাবা, শান্তি কমিটির এলাকার সভাপতি বলল তোমার লাশ নাকি সে নিজের চোখে দেখেছে।আমরা এখানে তোমার গায়েবানা জানাযা পরেছি।"
আমি তাদের শান্তনা দিলাম। আমি আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি।কিন্তু কখন মরব তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই।জীবন বাজি রেখেই যুদ্ধ করতে হয়। তোমরা আমার জন্যে শুধু দোয়া কর যেন দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারি।
বাড়ীতে দূ/চারদিন সময় দিয়ে আবারও শিবিরে ফিরে গেলাম। এবার আমার সাথে আমার বাবা,মা আর স্ত্রী।ছদ্মবেশ নিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে, পাক বাহিনী এবং রাজাকারদের চোখে বিভিন্নভাবে ধূলো দিয়ে শিবির পর্যন্ত গিয়ে পৌছলাম।পরিচিত আত্বীয়, স্বজনের সাথে আমার বাবা, মা এবং স্ত্রীকে রেখে আমি নিয়মিত মহড়ায় গেলাম।দূ/ একদিন মহড়া চলার পর নির্দেশ এল আমাকে আমার ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে চট্টগ্রাম যেতে হবে।ওখানের মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডে আছেন মেজর রফিকুল ইসলাম।
আমি আমার প্রায় ৫০ জনের একটি ক্ষুদ্র কমান্ড নিয়ে ধীর লয়ে এগিয়ে চললাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ সমতল,পাহাড়ী,বন জঙ্গল,নদী নালা পার হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।একসাথে নয়।ভেঙ্গে, ভেঙ্গে। সাধারন পথিকের বেশে,কৃষকের বেশে,কাজের লোকের বেশে। যার যেভাবে সুবিধা হয়, যে যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেই ভাবেই বেশ ধারণ করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি।বহুগ্রাম পেরিয়ে চলছি। এতগুলো মানুষের রাত্রি যাপন সহজ কথা নয়।পুরো গ্রাম লেগে যায়।
গ্রামে যেরকম আমাদের পক্ষের লোক আছে,তেমনই আমাদের বিপক্ষের লোকেরও অভাব নেই। তাই কয়েক রাত্রি বড় জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহন করতে হয়েছে।অবশেষে চট্টগ্রাম গিয়ে পৌঁছলাম।
চট্টগ্রামের অবস্থা তখন ভয়াবহ।সেখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কিছুদিন অবস্থান করলাম। পশ্চিম পাকিস্তানী জাহাজে করে অশ্র,গোলাবারুদ আসে। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ডুব দিয়ে জাহাজের কাছে গিয়ে জাহাজ বিধ্বংসী মাইন ফিট করে আসি। এভাবে আমরা একাধিক জাহাজ ধ্বংস করি। আমরা ওদের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছি। সেই তুলনায় আমাদের ক্ষতি কমই।তবুও আমার ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়।যারা কাছাকাছি এলাকার তাদের লাশ বাড়ীতে পাঠিয়ে দিই। আর যারা অনেক দূরের,তাদের এখানেই দাফন কাফন সম্পন্ন করি। এরপর আদেশ আসে টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দীকির বাহিনীতে যোগদান করার।দীর্ঘ একসপ্তাহ হেটে বাহিনীর অবশিষ্ট প্রায় দূই শত লোক নিয়ে টাঙ্গাইলের মধূপুরে গিয়ে পৌছলাম। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকির সাথে যোগাযোগ হল। তিনি আমাকে আমার বাহিনী সহ সাদরে গ্রহন করলেন। শুরু হল সশস্ত্র সংগ্রাম।
কাদের সিদ্দীকি আমাকে ঘাটাইলের ধলাপাড়াতে প্রেরণ করলেন। কয়েকদিন খন্ডখন্ড যুদ্ধের পর হঠাৎ একদিন ওয়ারল্যাসে পাকবাহিনীর কোন এক অফিসারের গলা ভেসে এল। পাকিস্তানে অবস্থান করার কারনে উর্দূ ভাষাটা ভালই আয়ত্বে এসেছে। ওয়ারলেসে
অফিসারকে পরিচয় দিলাম পাকবাহিনীর একজন কমান্ডার হিসেবে।তাকে আস্বস্ত করলাম যে আমি ধলাপাড়া গাঙ্গাইর মোরে আমার বাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছি তাদের জন্য।এখানে মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। তাদেরকে মারতে হবে। অফিসার বললেন, "আমি বাহিনী নিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে আসছি"।
অতঃপর আমার বাহিনীকে নির্দেশ দিলাম আমি নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে দাঁড়ানোর পরে ইশারা দেয়ার সাথে সাথে যেন অবিরাম গুলি বর্ষন করেন।
কিছুক্ষন পর সশস্ত্র পাক বাহিনীর প্রায় শ' খানেক যোদ্ধা ধলাপাড়া গাঙ্গাইর মোরে আসার সাথে সাথেই আমার বাহিনীকে ইশারা দিলাম গোলাবর্ষন শুরু করার। বৃষ্টিধারার মত গোলাবর্ষন শুরু হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাকবাহিনীর শ'খানেক সদস্য ধরাশায়ী হয়ে গেল।ধলাপাড়ার বুকে স্বস্তি ফিরে এল।
অতঃপর কাদের সিদ্দিকীর নির্দেশ অনুযায়ী টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা আক্রমন, রাজাকার নিধন কর্মসূচী চালাতে থাকি।মধুপুরের জনৈক রাজাকার নিধনের নির্দেশ আসে কাদের সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে।
মধুপুরের গড়ের কাছে তার বাস।তার নাম হাছেন আলী মেম্বার।কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে রাজাকার হাছেন আলী মেম্বার এর খোঁজে চললাম। মধুপুর গ্রামে গিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করতেই খোঁজ পেলাম। বাড়ীর কাছে গিয়ে ডাকতেই বেরিয়ে এল হাছেন আলী।
ষাটোর্ধ বৃদ্ধ।বেশ শান্ত সৌম্য চেহারা।তাকে পরিচয় দিলাম। বললাম আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। চলুন। তার পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি শুরু করল। তার শান্ত,সৌম্য মূর্তি দেখে আমার মনেও একধরনের মায়ার উদ্রেক হল। আমি আলাদা আলাদা ভাবে এলাকার বিভিন্ন জনকে হাসেনআলী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম সে কেমন লোক,কি সমাচার। তো এলাকাবাসী হাছেনআলী সম্পর্কে তথ্য দিল হাছেনআলী লোক হিসেবে ভাল।তার দ্বারা এলাকার কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
তবুও লিডারের আদেশ অনুযায়ী হাছেন আলীকে নিয়ে চললাম নদীর ধারে। মধূপুর ব্রীজের ওপর দাড় করালাম গুলি করার জন্য। হাছেনআলী দোয়া,দরুদ পরছে। রাইফেল তুললাম। ট্রিগারে আঙ্গুল টিপবো।
হাছেনআলীর ছোট্ট মেয়ের করুন কান্নার আওয়াজ যেন আমার কানে ভেসে এল।এমন সময় অলৌকিক ভাবেই বন্দুকটি হাত থেকে পরে গেল। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দূই দূই বার হয়ে গেল।শেষ পর্যন্ত ছালাম মিয়াকে আর মারা হলোনা। তাকে সাথে নিয়ে ফিরে এলাম আস্তানায়।
কাদের সিদ্দীকিতো দেখে আগুন।কেন একজন রাজাকারকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছি।আমি তাকে অনেক অনুরোধ করে কোন রকমে বুঝালাম যে এর সম্পর্কে যতটুকু শোনা গেছে তার পুরোটাই ঠিক নয়।উনার দ্বারা কারোর ক্ষতি হয়নি,হবেওনা।
কাদের সিদ্দিকী সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার দ্বারা যদি কোন ক্ষতি হয় এর দায়ভার আপনি নিবেন?
উত্তরে আমি বললাম," ঠিক আছে স্যার আজ থেকে উনার দায়িত্ব আমি নিলাম"।
তারপর প্রায় তিনমাস কেটে গেছে।পুরো এই সময় জুরেই তিনি মসজিদে নামায ও অন্যান্য ইবাদত,বন্দেগীতে কাটিয়েছেন।
অতঃপর আমার পূর্বপুরুষের ভিটা এবং আমার প্রথম দিককার শ্বশুরবাড়ী ঘাটাইল থানার ছয়ানি বকশিয়া গ্রামে আমার অল্প কয়েকজন লোকসহ, ছালাম সহ গেলাম। ওখানে ক্ষুদ্র,ক্ষুদ্র অপারেশন ছিল। ওগুলি সারলাম।
, আমার সুমুন্ধি মুক্তার হোসেনকে শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগদান করিয়েছি এবং প্রশিক্ষন দিয়েছি।
হাছেনআলী আমার শ্বশুরের পায়ে পরে বলল, " বাবা,আপনার মেয়ের জামাই খুবই বড় মনের মানুষ।আমাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন। আপনি উনাকে একটু বলে দিন যেন আমাকে ছেড়ে দেয়। আমি আমার বউ বাচ্চার কাছে যেতে চাই।"
আমার শ্বশুর,শ্বাশুরী সহ সবাই অনুরোধ করলে তারপর সত্যি সত্যি একদিন হাছেনআলীকে তার বাড়ীর কাছে নিয়ে রেখে আসি। হাছেনআলী যাওয়ার সময় সেকি খুশি।সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরলে খুশি হওয়ারই কথা। কিন্তু বিধিবাম।একদিন তার বাড়ীতে ডাকাত পরেছে।ডাকাত বাড়ীতে ঢুকেই আগে হাছেন আলীকে ছুড়িকাঘাতে হত্যা করে। আসলে যার মৃত্যু যেভাবে লেখা আছে সেভাবেই হবে। এটা ফেরানোর জো নেই।
এর মধ্যে ছোট ছোট বহু অপারেশন চালাতে থাকি ঘাটাইলের ঝরকা,পাকুটিয়া,কালিহাতির বিভিন্ন অঞ্চলে। গেরিলা আক্রমনের দক্ষতায় কাদের সিদ্দিকী আমার ওপর শতভাগ সন্তুষ্ট।বহু পাক সেনাকে নিজ হাতে খতম করেছি।
মধুপুরেরই এক গ্রামে ডাকাতের উৎপাত খুব বেশি বাড়তে থাকে।ডাকাতের নাম হামেদ আলী।হামেদ আলীর নামে মধূপুরের জনগন কাদের সিদ্দীকির কাছে অভিযোগ করে।হামেদআলী তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মানুষের বাড়ী বাড়ী গিয়ে নগদ অর্থ,সোনাদানা সহ বিভিন্ন সম্পদ কেড়ে নেয়।মানুষকে মারধর করে।অনেককেই জানেও মেরে ফেলে।পাকবাহিনীর রাজাকার হিসেবেও কাজ করে।
কাদের সিদ্দীকি আমাকে দায়িত্ব দেয় হামেদআলীকে খতম করার। আমি ৫ জন গেরিলা যোদ্ধাদের নিয়ে শমশেরের সন্ধানে চলি। রাত ১০ টায় শমশেরের বাড়ী ঘেরাও করি।হামেদআলী পাখির মত উড়াল দিয়ে পালিয়ে যায়। আমরা উৎ পেতে থাকি।এক বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,"শমসের কোথায় থাকে জান?"
বাচ্চাটি একটি খড়ের গাদা দেখিয়ে বলেছিল," আমরা তাকে মাঝে মাঝে এর ভেতরে ঢুকতে দেখি।"
তখন আনুমানিক রাত ১২ টা। আমি খড়ের গাদার কাছে গিয়ে সন্দেহের উপর নির্ভর করেই ঘোষনা দিলাম," হামেদআলী,বেরিয়ে এসো, নচেত গাদায় আগুন ধরিয়ে দেব।"একটু পরে হামেদআলী বেরিয়ে আসে। তৎক্ষনাৎ গ্রেফতার করে ফেলি তাকে।কালিহাতীতে নিয়ে আসলাম কাদের সিদ্দীকির কাছে।অবশিষ্ট রাত এক বাড়ীতে রাখলাম।৪ জনকে দায়িত্ব দিলাম তার দেখাশুনা করার জন্য।
হামেদআলীকে হাতেপায়ে শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল।সকাল বেলা কাদের সিদ্দীকি সাহেব সহ আমরা অনেকেই এসেছি।হামেদআলী নেই।আশ্চর্য্য! শেকল দিয়ে বাঁধা,দরজা বন্ধ,প্রহরায় ৪ জন।এটা কিভাবে সম্ভব হল? সিদ্দীকি সাহেব রেগে আগুন। উনি আমাকে বললেন," যেখান থেকে পারেন,যেভাবে পারেন,শমসেরকে চাই।
আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম।স্যার,২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে জীবিত বা মৃত হাজির করবো।
টু আই সি
কোম্পানি পরিচালক
সিরাজ তালুকদার, দশানী
জিয়াউল হক,ভারৈ
আঃ হামিদ ভোলা, ভারৈ
আঃ আলীম তালুকদার,শিয়ালখোল
এনায়েত করিম
হায়দার তালুকদার
আশরাফ তালুকদার
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন