আঃ হক মাস্টার ও তার বংশধর

 

আঃ হক মাষ্টার এবং তার বংশধর

মরহুম জনাব আঃ হক মাষ্টারের দুই ছেলে মরহুম জনাব শহিদুর রহমান জঙ্গু এবং মরহুম জনাব আশরাফ আলী। শহিদুর রমান এর দুই ছেলে মরহুম আমিনুল ইসলাম লিচু এবং মরহুম বাদল, চার মেয়ে মরহুমা কুসুম,নিমকি,লুচি,সুজি।

মরহুম আমিনুল ইসলাম লিচুর ঘরে ছয় ছেলে খালিদুর রহমান মুক্তা, খালেদুর রহমান হীরা ওরফে আঃ রহমান, খলিলুর রহমান পান্না, খায়রুল বাশার পলাশ,পারভেজ, খাদেমুল ইসলাম পাপন।

আমাদের জীবনী লিখছি আমি খালিদুর রহমান মুক্তা। আমাদের কোন বোন নেই।
একটি মেয়ের আশায় আমাদের বাবা মা ছয় ছয়টি ছেলে সন্তান নেন।শুনেছি আরও এক ভাই নাকি হওয়ার সময়ই মারা গেছে।

আমার জন্ম হয়েছে ১৯৭৮ সালে। কুসুম ফুপু মারা যান আমার জন্মের কিছু কাল আগে বা পরে। তিনি এক ছেলে, চার মেয়ে রেখে যান। কুসুম  ফুপুর  কথা আমার মনে নেই। বাদল কাকাকে কিছু লোক শত্রুতা সাধনের জন্য মেরে ফেলে।বাদল কাকা বিয়ে করেননি, তাই তার বউ,ছেলে,মেয়ে নেই।

আজকে আলোচনা করতে চাচ্ছি আমার বাবা জনাব মরহুম আমিনুল ইসলাম লিচু সম্পর্কে। মানুষ মারা যাবার পর পরবর্তী প্রজন্ম তার কথা বেশিদিন মনে রাখেননা।

আমার ছোট ছেলে ইউসুফ তার দাদাকে দেখেনি কারন তার জন্মই হয়েছে আব্বার মৃত্যুর এক বছর পর।

আব্বার  জীবনী আলোচনা করতে গেলে আমার দাদার জীবনী এমনিতেই আলোচনায় এসে যায়।

দাদা মরহুম শহিদুর রহমান জঙ্গু তার জীবনে সংসারী কাজকাম তেমনটা করতেননা। সারা বছর অসুস্থ থাকতেন।তবে তার শখ ছিল মাছ মারা। এই মাছ তিনি বিক্রী করতেননা। নিজেরা খেতেন। অন্য মানুষ তথা প্রতিবেশীদেরকে দিতেন।

দাদার মা মানে মরহুম আঃ হক মাষ্টার সাহেবের স্ত্রী দাদাকে প্রায়ই বলতেন
কাম থুইয়া মারে মাছ,বিধী লাগে তার পাছ।

সত্যিই বিধি তার পাছে লেগে ছিল। তার পরিবারের সদস্যরা মানে দাদী, আব্বা,ফুপুরা, কাকা বহুদিন গেছে তারা অভূক্ত থেকেছেন।

তাদেরকে বিশেষ করে অপেক্ষা করতে হতো কখন যোগিনীমুড়া দাদীর বাপের বাড়ী থেকে  অনুদান আসবে।

আমরা যোগিনীমুড়া বাসীদের কাছে পারিবারিক ভাবেই ঋণী।

আমার বাবা জ্বনাব আমিনুল ইসলাম জন্মগ্রহন করেন আনুমানিক ১৯৪৫ সালে।প্রচন্ড অভাবের সংসার হওয়ায় আব্বাকে ছোটবেলা থেকেই  কঠোর পরিশ্রম করতে হতো।

একদিন মরিচের টাল নিড়াতে গিয়ে আব্বা দাদাকে বলেছিলেন," অনেকেই বলছে কামলা দিতে, দিবনাকি?"

দাদা নিড়ানী যন্ত্র রেখে দিয়ে রাগত স্বরে বলেছিলেন," কে তোকে কামলা দিতে বলেছে? যে বলেছে তার ছেলে মেয়েদেরকেই কামলা দিয়ে চলতে হবে। আমি জীবনে এমন কোন পাপ করিনি যার জন্য আমার ছেলেকে কামলা দিয়ে খেতে হবে।

দাদার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। আব্বাকে কামলা দিতে হয়নি বরং সম্মানজনক রিযিকের ব্যাবস্থা আল্লাহপাক করে দিয়েছিলেন।

আব্বা সারা জীবনে মাত্র এক বছর স্কুলে যেতে পেরেছিলেন। অভাবের কারনে তার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।কিন্তু তাঁর হাতের লেখাগুলো এত সুন্দর ছিল।ধারনাতীত।

একাডেমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত।আমি যখন প্রাইমারী ছাত্র তখন দেখতাম আব্বা প্রতি সপ্তাহে

ম্যাগাজিন,গল্প,উপন্যাস,নাটকের বই নিয়ে আসতেন।সগুলো তিনি পড়তেন। আব্বার বোধ হয় নিয়ত ছিল পারিবারিক পাঠাগার গড়ে তোলা।বই গুলো ঘর থেকে হারিয়ে গেছে। আজ সেগুলো সংগ্রহে থাকলে পুরনো ঐতিহ্য ধারন করতে পারতো।

আমার দাদী মরহুম সাজেদা বেগম তৎকালীন সময়ে আজকের যেটা জে এস সি সেকালে সেটা ছিল মাইনর পাশ,তিনি মাইনর পাশ ছিলেন।

দাদীও পড়ুয়া ছিলেন। তার কাছেও পুরনোকালের বইপত্র ছিল। মনেপরে একটা বইয়ের নাম ছিল "গল্প হলেও সত্যি" এই বইয়ে হাদীস গুলো গল্পের আকারে বর্ননা করা ছিল।

সাহাবী এবং সাহাবী পরবর্তী খলিফাদের বিভিন্ন ঘটনা বর্ননা করা থাকতো। আমি তখন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র। খুব আগ্রহ সহকারে পড়তাম।

সংসারে যখন প্রচন্ড অভাব তখনও দাদার মাথায় সংসার নিয়ে তেমন কোন চিন্তা পরিলক্ষিত হতোনা।

তার কথা একটাই ছিল আল্লাহপাক রিযিকের ব্যাবস্থা করে দেবেন। ইমানের জোড় ছিল অসম্ভব।দূতিন দিন করে না খেয়ে থেকেছেন কিন্তু কখনও মুখ ফুটে কারোর কাছে কিছু চাননি।কেউ বুঝতেও পারেনি এই মানুষ গুলো না খেয়ে আছে।

দাদার অভাব যতই থাকুক,তার  পোষাক পাজামা পাঞ্জাবী সবসময়ই  চকচকে থাকতো।আঃ হক মাষ্টারের ছেলে বলে কথা।

এক সময় দাদী তৎকালীন ই পি এ ডি সি ( ইষ্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) পরবর্তী সময়ে বি এ ডি সি ( বাংলাদেশ এগ্রকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) উক্ত প্রতিষ্ঠানের ময়মনসিংহ জোনের  প্রধান নির্বাহী( নামটা এখন আর মনে নেই),উনার কাছে দাদী বড় ভাই সম্বোধনে সুন্দর করে একটা চিঠি লিখেন।

সংসারের টানাপোড়েন এবং ছেলের একটা চাকুরীর প্রয়োজনীয়তাই ছিল চিঠির বিষয়বস্তু। এক চিঠিতেই আব্বার চাকুরী হয়ে যায়।

এটা সেই ১৯৬৭/৬৮ সালের কথা। ই পি এ ডি সি(সেচ) ছিল কৃষির ওপর  পরীক্ষামূলক ভাবে গৃহীত  মাত্র এক বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প। কিন্তু সেচ প্রকল্প ব্যাপক ভাবে কৃষিক্ষেত্রে সাড়া ফেলায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে বাড়তে আজো পর্যন্ত আছে।

আব্বার বয়স তখন আনুমানিক ২৫ বৎসর। অবস্থা যত খারাপই থাকুক পোষাক আশাক সব সময়ের জন্যই ছিল চকচকে, রুচিশীল। আব্বা যে ঘরটাতে গরু রাখতেন (গোয়াল ঘর) সেই ঘরও এতটাই পরিচ্ছন্ন থাকতো, যে কেউ দেখলে খুবই প্রশংসা করতো।

ব্যাক্তিত্ব,রুচি,মানসিকতায় তার তুলনা চলতো কেবল আঃ হক মাষ্টার সাহেবের সাথে।

এরপর মুক্তিযুদ্ধ এসে যায়।
সারা দেশব্যাপি সশস্ত্র পাক সেনাদের অত্যাচার,নিপীড়ন,নির্যাতন,হত্যা,অগ্নি
সংযোগ, ধর্ষণের লোমহর্ষক বর্ণনা সিনেমা,গল্পে,উপন্যাসে,পত্রপত্রিকায়,  আব্বার কাছ থেকে শুনেছি।

আব্বা তখন যুদ্ধে যাবার মত বয়স হলেও দাদা,দাদী যেতে দেননি। বড় ছেলে। সংসারের সমস্ত দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। এদিকে চাকুরী করাও অসম্ভব ছিল।

সংসারের চাহিদা মেটানোর জন্য তিনি ইন্ডিয়া থেকে সাইকেল যোগে লবন,কেরোসিন এনে বাংলাদেশে বিক্রী করতেন।স্বল্প পুঁজি। কোন রকমে কিছু খাবার যোগান এবং দাদার চিকিৎসার যোগান দিতেন।

বহুবার তিনি পাক সেনাদের হাতে ধরা পরেছেন। ভাল উর্দূ জানতেন। পাকসেনাদের সাফাই গেয়ে গেয়ে তিনি মৃত্যুর দূয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। কোন এক সময়ে অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়।

এক জায়গায় আটকে যান প্রায় ১৫ দিনের মত। ভাত জুটেনি।পানি খেয়ে খেয়ে বেঁচে থাকেন। আধামরা অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছেই অজ্ঞান হয়ে যান।

অবস্থা বুঝে দাদী আউষ ধানের পান্তা ভাত ভাল করে মাখিয়ে একটু একটু করে খাইয়ে তাঁকে সুস্থ্য করে তোলেন। পরদিনই ঘরের চাল ছন দিয়ে ছাঁওয়া শুরু করেন।ঘরে বৃষ্টির পানি পরে।

১৬ ই ডিসেম্বর,১৯৭১ দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। পাক বাহিনী মুক্তি বাহিনী ও  ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিত সিং অরোরার কাছে আত্বসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

১০ ই জানুয়ারী ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান জেল থেকে দেশে ফিরে আসেন। প্রধান মন্ত্রীত্ব গ্রহন করেন। অন্যান্য দাফতরিক কাজের সাথে সাথে বি এ ডি সি তার কার্যক্রম শুরু করে। 

আমাদের গ্রামের আঃ ছাত্তার দাদা, কলিমউদ্দিন দাদার সাথে আব্বা পুনরায় বি এ ডি সি তে যোগদান করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রী বানিজ্য। বহু মানুষ যারা রাইফেল ছুঁয়ে দেখেনি, ভারতে বাংলাদেশী শরনার্থী শিবিরে যায়নি তারাও জেনারেল এম এ জি ওসমানি স্বাক্ষরিত সনদের বলে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা বনে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহন করছে।

ছেলে মেয়ে, নায় নাতিরাও চাকুরীর কোটা সুযোগ সুবিধা গ্রহন করছে।

অন্যদিকে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যারা প্রকৃত পক্ষেই দেশের জন্যে লড়েছেন,যারা এক টুকরো কাগজের বিনিময়ে দেশের প্রতি তাদের নিঃস্বার্থ ভালবাসাকে বিক্রী করেননি,তারা ভিক্ষা করছে, রিক্সা চালাচ্ছে, বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। এইতো আমার বাংলাদেশ।

আব্বা  চাইলে এরকম সনদ সংগ্রহ করতে পারতেন। করেননি কারন তিনি মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা,ধোঁকাবাজির সুযোগ নেয়া ভাল মনে করেননি।

যাই হোক, বি এ ডি সি তে অত্যান্ত আন্তরিকতা সহকারে কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়ার কারনে অল্পদিনেই তিনি তার বস্ এবং সহকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।

বি এ ডি সি এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত থাকায়, বিভিন্ন মিটিং মিছিলে ভাল বক্তৃতা দিতে পারায় তার সুনাম সারা বাংলাদেশের বি এ ডি সি কর্মচারীদের মাঝেই ছড়িয়ে যায়।

তৎকালীন সময়ে ডিপটিউবওয়েল গুলো সরকারী আয়ত্বাধীন ছিল। ড্রাইভার, মেকানিক সরকারী কর্মচারী ছিল। তেল খরচও সরকারী ছিল। জনগন শুধু ভাড়া দিত। আর সুযোগ ভোগ করতো।

ডিপ টিওবওয়েল গুলো সব জায়গায় সেট করা যেতনা বলে ইয়ানমার,রাষ্ট্রন,কবুতা এবং চাইনিজ ডংফেন ডিজেল ইঞ্জিন দেশে আমদানী করা হয়। এগুলো আমদানী করা হতো বি এ ডি সির মাধ্যমেই। এগুলো বিদেশ থেকে আনা হতো, রিওয়ারিং করা হতো এবং দেশের জনগনের কাছে বিক্রী করা হতো।

তারমানে পর্যায়ক্রমে সেচ ব্যাবস্থার প্রাইভেটাইজেশন হয়ে যায়। এ সময়ে এক একজন মেকানিক প্রতি সিজনে মেশিন মেরামত করে প্রচুর টাকা কামাই করে। আব্বাও করতেন।

কিন্তু দূঃখজনক হলেও সত্য। বাংলাদেশ একটা চোরের খনি।বঙ্গবন্ধু সারে সাত কোটি কম্বল বিদেশ থেকে এনে দেশের মানুষকে দেয়ারপর নিজের কম্বলটা খুঁজে পাননি। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে পাওয়া একটি ঘটনা এরকম....

দেশ স্বাধীন হবার পর জনৈক মুক্তিযোদ্ধা কৃষক ভালবেসে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার  বাড়িতে তার জন্য নিজের আবাদকৃত  কিছু শাকসবজি নিয়ে আসে।
বঙ্গবন্ধু ব্যাস্ততার কারনে নিচে না এসে তার সহকারীকে দিয়ে বিশটি টাকা ঐ কৃষকের জন্য  পাঠিয়ে দেন।

আবার কি মনে করে তিনি নিজেই নিচে চলে আসার পর ঐ কৃষক তাকে দশটাকার একটি নোট দেখিয়ে বলেছিলেন, লিডার, আমি এই দশটাকার জন্য আপনার প্রতি আমার ভালবাসাকে বিক্রী করতে পারবোনা।

বঙ্গবন্ধু দূঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলেন হায়, যে দেশে দুতলা থেকে নিচ তলায়  জনগনের জন্য আমার পাঠানো সাহায্যের পরিমানের অর্ধেক হারিয়ে যায়,মধ্যস্বত্তভোগীরা খেয়ে ফেলে,  সেই দেশে জনগনের ভাগ্য আমি কি করে ফেরাবো?
 
বলছিলাম বি এ ডি সি( সেচ) এর কথা। বি এ ডি সিতে প্রতি বছর লস হতে থাকে। মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, তেল ইত্যাদি চুরি করে বিক্রী,বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ভাওচার প্রদর্শনের জন্য বি এ ডি সি তার দেশ সেবার জায়গা থেকে নেমে এসে চোরদের ব্যাবসায় কারখানা হয়ে যায়।

খালেদা জিয়া সরকার ঘোষনা করে বি এ ডি সি সেচ বন্ধ করে দেয়া হবে। যারা Golden hand shake তথা স্বেচ্ছায় অবসরে যাবেনতো যান নচেৎ সরকার আপনাদের চাকুরীর নিশ্চয়তা দেবেনা। প্রায় ৯০% কর্মচারীরা স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নেয়।

আব্বাও সেই স্বেচ্ছায় অবসরের শিকার হয়ে ১৯৯৫ সালে বাড়ী চলে আসেন।এক কালীন প্রায় লাখ তিনেক টাকা পেয়েছিলেন।ঐ সময়ে আমি শ্রীবরদী সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।

ঐ বছর আমরা জমি আবাদ করে প্রায় ১৫০ মন ধান পেয়েছিলাম।কৃষিকাজ যে কি পরিমান কষ্টের সেটা হারে হারে বুঝেছি।রোপা লাগানো, ক্ষেত নিড়ানো,ক্ষেতে পানি দেয়া,সার দেয়া, ধান পাকলে ধান কাটা,ধান সেদ্ধ করা,শুকানো, ধান ভানা,ধান বা চাউল গোলায় তোলা কঠিন এবং কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়।

কৃষকেরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ অথচ এই কৃষকেরাই বঞ্চিত হয় যখন তাদের উৎপাদিত ফসলের যথাযথ মুল্য পায়না।

এর পরে আমরা  আর কৃষি কাজে যাইনি।যদিও  কাজটা বজায় রাখলে ভাল হতো।ঘরের ধানের ভাত খেতেও ভাল,অনেক সময় গোলার ধান বিক্রী করেও বিপদ আপদ পারি দেয়া যায়।

আব্বা যেহেতু রিটায়ার্ড পার্সন,সেহেতু তিনি সারাক্ষন বাড়ীতেই থাকেন।সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে মসজিদ,মাদ্রাসা,শালিস দরবারে নিয়মিত অংশগ্রহন করতে করতে এমন একটা পর্যায় চলে আসলো যে, তার ব্যাক্তিগত কাজ করার মত সময় একদম হাতেই থাকেনা।

মাতব্বর গীরি করা তার নেশা হয়ে উঠে। মানুষের আহ্বানকে আর কখনই উপেক্ষা করতে পারেননা।

এদিকে সংসারে চরম দারিদ্র্য নেমে আসে। নিয়মিত রোজগার না থাকলে যা হয়।উচিৎ ছিল বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করা কিন্তু আমি তা পারিনি।

হয়তোবা আমার সেই ম্যাচিউরিটিই আসেনি তখনও।

আমি অবস্থান করতাম টাঙ্গাইল নানাবাড়িতে।যার জন্য সংসারের দূরবস্থা আমায় তেমন স্পর্শ করেনি।একদিকে আমি এবং আমার ছোটভাইদের লেখাপড়ার খরচ,অন্য দিকে সংসারের সবার ভরনপোষন সব মিলিয়ে আব্বা আম্মাকে বেশ পেরেশানীতে পরতে হয়।

ধার দেনা সংসারের ওপর বোঝার মত চাপতে থাকে।অবশেষে আব্বা পুনরায় ১৯৯৯ সালে সিনহা টেক্সটাইল মিল, নারায়নগঞ্জে তার বন্ধু শাহজাহান দাদার অধীনে চাকুরী করতে যান।

শাহজাহান দাদা পাকিস্তানামলের টেক্সটাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জনিয়ার ছিলেন। সরকারী মিলের ম্যানেজার ছিলেন। সরকারী মিল গুলি বেসরকারী মালিকানাধীনে  চলে যাওয়ায় উনাদের মত যোগ্য লোকেরা বেসরকারি চাকুরি শুরু করেন।

পাকিস্তানামলে যেটা শারমিন টেক্সটাইল মিল নাম ছিল পরবর্তীতে বাংলাদেশ হওয়ার পর কয়েক হাত বদল হয়ে আনিসুর রহমান সিনহা সাহেব টেক্সটাইল মিলটি কিনে নেন।

তার নামানুসারেই উক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম করন করা হয় সিনহা টেক্সটাইল মিলস। কারখানাটি নারায়নগঞ্জ জেলার, সোনারগাঁ থানার কাঁচপুরে  শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত।

ইতোমধ্যে ২০০০ সালে ঘাটাইলের জিবিজি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে আমার বি এ (পাস) পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। আমি তখন সাগরদীঘির ইমান আলী রেজা ভাইয়ের  অগ্রদূত একাডেমীতে শিক্ষকতা করি।

সর্বসাকুল্যে বেতন ৫০০ টাকা,তাও আবার মাসেরটা মাসে ক্লিয়ার হয়না।

বাড়ী থেকে আম্মা এসে রাত্রে মামাদেরকে নিয়ে  আমাকে নিয়ে মিটিং বসে। আমার যত দোষ, সব কিছু চর্চা হতে থাকে।

আমি  আসামি। সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন সকালে নারায়নগঞ্জে আব্বার কাছে গিয়ে আমাকেও মিলে যোগদান করতে হবে।

গেলাম। প্রায়  দুমাস বসে থাকার পরে উইভিং সেকশনের কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিভাগে ইন্সপেকটর হিসেবে যোগদান করি।

উইভিং থেকে ম্যানেজার শাহজাহান দাদার সাথে আমাকেও আর এন্ড ডি ( রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট) শাখায় স্থানান্তর করা হয়।

প্রচন্ড উত্তাপ, কাজের অসম্ভব চাপ,বসদের দূর্ব্যাবহার সব মিলিয়ে অসহ্য পরিবেশ যেন দম বন্ধ আসার জোগার। এদিকে খাওয়ার কষ্ট। নিজেরা পাকিয়ে খেতে হয়।ভাল করে পাকাতে না পারার জন্য ভাল করে খেতেও পারিনা।

জীবনে আরও একটা ভুল করে ফেললাম শিলাকে  বিয়ে না করে। আমারই ভুলে প্রায়ই হয়ে যাওয়া বিয়েটা হলনা।

প্রচন্ড আফসোসে পরবর্তী ছয়টা মাস আমি প্রায় না খেয়ে থেকে থেকে একবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। কি যে মানসিক অশান্তি।

পরে আব্বার সাথে বনিবনা না হওয়ায় মামাকে অভিভাবক হিসেবে শহিদের ঘটকালিতে বিয়ে করলাম ছালমাকে। তখন ও মাত্র দশম শ্রেনীর ছাত্রী।

আমার শ্বশুরবাড়ীর লোকেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি তাদের যোগ্য মেয়ের জামাই হতে পারিনাই।তাই আমার ওপর দিয়ে চলল মানসিক অত্যাচার প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে। বুঝলাম নদী থেকে পতিত হয়েছি সাগরে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যোগিনীমুরা উচ্চ বিদ্যালয়,শেরপুর

শাহিন মিয়া,বিএসপি,প্রতিষ্ঠাতা(Dohps

মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব আলী